১৮৩১ সালের নভেম্বর মাস। উত্তর ২৪ পরগনার নারকেলবেড়িয়া গ্রামে বাঁশ আর কাদায় গড়া একটি দুর্গের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কামান আর আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যবাহিনী। আর সেই দুর্গের ভেতরে লাঠি, বর্শা, ধনুক-বাঁশ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক নিরক্ষর কৃষকনেতা—সৈয়দ মীর নিসার আলী, যিনি ইতিহাসে তিতুমীর নামে অমর হয়ে আছেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত এই সংগ্রামই বারাসাত বিদ্রোহ নামে পরিচিত, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার প্রথম সশস্ত্র কৃষক প্রতিরোধের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিতুমীর কে ছিলেন? তিতুমীরের প্রকৃত নাম সৈয়দ মীর নিসার আলী। তিনি ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে (১৪ মাঘ ১১৮৮ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাট মহকুমার চাঁদপুর (মতান্তরে হায়দারপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মীর হাসান আলী এবং মাতা আবিদা রোকাইয়া খাতুন। তাঁর পরিবার হযরত আলী (রা.)-এর বংশধর বলে দাবি করত। গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। তিনি কুরআনের হাফেজ ছিলেন এবং বাংলা, আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ইসলামি ধর্মশাস্ত্র, আইনশাস্ত্র, দর্শন ও তাসাওয়াফে তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন। মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে তিনি একজন দক্ষ কুস্তিগীর হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। ১৮২২ সালে তিতুমীর হজ পালনের জন্য মক্কা যান। সেখানে তিনি বিখ্যাত ইসলামি সংস্কারক ও বিপ্লবী নেতা সাইয়িদ আহমদ বেরেলীর সান্নিধ্য লাভ করেন। সাইয়িদ আহমদ তাঁকে বাংলার মুসলমানদের অনৈসলামিক রীতিনীতি পরিহার এবং বিদেশি শক্তির পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৮২৭ সালে দেশে ফিরে তিনি চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলায় ইসলামি অনুশাসন প্রচার শুরু করেন। বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট ও কারণ তিতুমীরের আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার। মুসলিম সমাজে শির্ক ও বিদআতের অনুশীলন নির্মূল করা এবং মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের অনুশাসন অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল তাঁর আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য। কিন্তু ধীরে ধীরে এই আন্দোলন জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে রূপ নেয়। তৎকালীন বাংলার গ্রামীণ সমাজে ত্রিমুখী শোষণ চলছিল—ব্রিটিশ শাসন, হিন্দু জমিদারদের শোষণ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের আঘাত। ইউরোপীয় নীলকররা কৃষকদের জমি দখল করে নীল চাষে বাধ্য করত। অন্যদিকে স্থানীয় জমিদাররা কৃষকদের উপর অযৌক্তিক কর আরোপ করত। বিশেষ করে পুণরা (Purha)-র জমিদার কৃষ্ণদেব রায় দাড়িওয়ালা মুসলিমদের উপর একটি বার্ষিক কর আরোপ করলে তিতুমীরের নেতৃত্বে কৃষকরা তা দিতে অস্বীকার করে। তিতুমীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তখন তিনি নিজেই একটি বাহিনী গড়ে তোলেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নেন। বাঁশের কেল্লা: প্রতিরোধের প্রতীক ইংরেজ শক্তিকে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে তিতুমীর ১৮৩১ সালে কলকাতার নিকটবর্তী নারিকেলবাড়িয়া (বা নারকেলবেড়িয়া) নামক স্থানে একটি বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং এর চারপাশে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন, যা ইতিহাসে ‘তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা’ নামে বিখ্যাত। ১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর বিদ্রোহীরা নারকেলবেড়িয়া গ্রামকে তাদের সদর দপ্তর হিসেবে নির্বাচন করে এবং চারপাশে একটি মজবুত বাঁশের বেড়া নির্মাণ করে। বাঁশ ও কাদা দিয়ে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট এই কেল্লাটি নির্মিত হয়েছিল। গ্রাম থেকে বহু বাঁশ কেটে বাঁশের গায়ে আরেকটি বাঁশ সংলগ্ন করে প্রাচীর তৈরি করা হয়েছিল। তিতুমীর তাঁর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন যে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সমরপ্রস্তুতি ও উপযুক্ত সেনা-প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাই এই কেল্লায় তিনি কৃষক-প্রজাদের নিয়ে প্রচলিত ও সনাতন অস্ত্রে সজ্জিত একটি বাহিনীকে সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষণ দেন। এই বাহিনী স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিতুমীরের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা স্থাপন করে। তিতুমীর নিজেকে একজন স্বাধীন শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং “কৃষক-রাজ” (Krishak-Raj) ধারণার প্রচলন করেন। তিনি ১৫,০০০-এরও বেশি কৃষক-সৈন্য সংগ্রহ করেন, যারা লাঠি, ধনুক-বাঁশ, বর্শা ইত্যাদি মৌলিক অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টারের মতে, এই বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। বিদ্রোহের সূচনা ও প্রাথমিক সাফল্য ১৮৩১ সালের অক্টোবরে তিতুমীরের বাহিনী পুণরার জমিদারের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। গ্রামটি আক্রমণ ও লুণ্ঠন করা হয়। এরপর তারা নদীয়া জেলার আশপাশের গ্রামেও আক্রমণ শুরু করে। নভেম্বরের শুরুতে বাদুড়িয়ার নীল কারখানার সহকারী পিরন কলকাতায় তাঁর নিয়োগকর্তাদের জানান যে, যদি দমনমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে “সরকারের জন্য গুরুতর বিপদ ঘটবে”। কিন্তু সরকার প্রাথমিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক ছিল। তবে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ১৭ নভেম্বর ১৮৩১ তারিখে বারাসতের কালেক্টর আলেকজান্ডার বশিরহাটের দারোগাকে নিয়ে তিতুমীরের বিরুদ্ধে অভিযানে যান। কিন্তু তিনি শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন। আলেকজান্ডারের বাহিনীতে ১০০ জন সৈন্য ছিল, অন্যদিকে বিদ্রোহীদের সংখ্যা ছিল ৬০০ জন, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন গোলাম মাসুম (ঘোড়ায় চড়ে)। আলেকজান্ডারের বাহিনী সম্পূর্ণভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কলকাতা মিলিশিয়ার জমাদার, ১০ জন সিপাহী এবং ১৩ জন বরকন্দাজ নিহত হন। বশিরহাটের দারোগা ও কালীগঞ্জ থানার জমাদার আহত ও বন্দী হন। আলেকজান্ডার নিজে “প্রাণভয়ে পালিয়ে যান” এবং অত্যন্ত কষ্টে রক্ষা পান। এই পরাজয়ের পর এজেন্সিতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কোষাগারের সম্পদ নৌকায় করে সুন্দরবন হয়ে কলকাতায় পাঠানো হয়। ব্রিটিশ পাল্টা আক্রমণ ও বাঁশের কেল্লার পতন আলেকজান্ডারের পরাজয়ের খবর পৌঁছালে ব্রিটিশ সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। তদানীন্তন বড়লাট উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমীরকে দমন করার জন্য ১৭ নভেম্বর ১৮৩১ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে একটি বিরাট সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেন। নদীয়া ও গোবরডাঙার জমিদাররাও তাদের পাইক-বরকন্দাজদের একত্র করে ইংরেজ বাহিনীর সাথে মিলিত হয়। ১৮ নভেম্বর ১৮৩১ তারিখে ব্রিটিশ মেজর স্কট, লেফটেন্যান্ট শেক্সপিয়ার এবং মেজর সাদারল্যান্ডের নেতৃত্বে অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যসহ বাঁশের কেল্লার উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালানো হয়। ইংরেজদের আধুনিক মারণাস্ত্র ও কামানের গোলার আঘাতে বাঁশের কেল্লার প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টার বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের পর কেল্লা ব্রিটিশ কামানের গোলায় ধ্বংস হয়ে যায়। আত্মসমর্পণ বা পলায়নের চেয়ে দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ শ্রেয়তর মনে করে তিতুমীর ও তার ৪০ জন অনুসারী সম্মুখ সমরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শহীদ হন। ব্রিটিশ কমান্ডিং অফিসার তিতুমীরের অসাধারণ বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যা তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য প্রেরণাদায়ী ছিল। বিদ্রোহের পরিণতি বাঁশের কেল্লার পতনের পর ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের বাহিনীর প্রধান গোলাম মাসুমসহ প্রায় আড়াইশ জনকে বন্দী করে। সবমোট ১৬০ জনের বিচার হয়। গোলাম মাসুমের প্রাণদণ্ড, ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১২৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। শহীদ তিতুমীরের সাথী গোলাম মাসুমকে বাঁশের ভাঙা কেল্লার সামনেই ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ব্রিটিশ বাহিনী স্থানীয় বাড়িঘরে আগুন লাগায় এবং প্রকাশ্যে তিতুমীরের মৃতদেহ পুড়িয়ে দেয়। বাঁশের কেল্লা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও উত্তরাধিকার বাঁশের কেল্লা শুধুমাত্র একটি সামরিক দুর্গ ছিল না; এটি ছিল ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির দুঃসাহস, দেশপ্রেম ও প্রতিরোধের এক অনন্য প্রতীক। যদিও এই বিদ্রোহ সফল হয়নি, তবুও এটি পরবর্তী কৃষক আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য এক বিশাল প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে। তিতুমীরের বিদ্রোহকে ইতিহাসবিদরা “বাংলার কৃষকদের প্রথম সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ” হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর বাঁশের কেল্লা বাংলার লোকসাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে স্থান পেয়েছে। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা সার্ভিসের শ্রোতারা তিতুমীরকে “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি” তালিকায় ১১তম স্থানে ভোট দেন। ১৯৯২ সালের ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশ তিতুমীরের ১৬১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। নারকেলবেড়িয়ায় তিতুমীরের স্মৃতিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। প্রতি বছর ১৯ নভেম্বর শহীদ তিতুমীরের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। তিতুমীরের বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল সেনাবাহিনীর কাজ নয়; সাধারণ কৃষক, তাঁতি ও শ্রমজীবী মানুষের সম্মিলিত শক্তিই ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। বাঁশের কেল্লার সেই অগ্নিঝরা দিনগুলি আজও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় হয়ে রয়েছে। তথ্যসূত্র বাংলাপিডিয়া, “তিতুমীর” Digital District Repository, Ministry of Culture, Government of India বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, “বাঁশের কেল্লা কি?” Qeyamuddin Ahmad, Wahabi Movement in India Md Shahnawaz Khan Chandan, “Remembering the Martyr”, The Daily Star বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ড, “তিতুমীরের বিদ্রোহ” Wikipedia, “Tariqah-i-Muhammadiya” Wikipedia, “Titumir’s rebellion” দৈনিক যুগান্তর, “বাঁশের কেল্লা: ত্রিমুখী শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ” Post navigation বারাসাতের হারিয়ে যাওয়া ঘোড়দৌড়ের মাঠ বিবির হাট, বারাসাত: ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া এক বাজারের গল্প