বারাসাত শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোর মধ্যে একটি হলো হাটখোলা। আর এই হাটখোলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিবির হাট—যা আজ একটি পরিচিত কাঁচা বাজারের নাম হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় আড়াইশো বছরের এক বিস্মৃত ইতিহাস।

ইতিহাসের সূত্রপাত ও নামকরণের রহস্য

উত্তর চব্বিশ পরগনার জেলাসদর বারাসাতে এবং আশেপাশে অসংখ্য হাট-বাজারের সন্ধান মেলে। এর মধ্যে বেশিরভাগ বাজারই তৈরি হয়েছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর। কিন্তু তার ব্যতিক্রম হলো বারাসাতের ‘হাটখোলার হাট’ বা ‘বিবির হাট’। এটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং দু’শ পঞ্চাশ বছরের পুরাতন একটি হাট।

ইতিহাসের বই অনুসারে, ১৭৬৪ থেকে ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এই হাটটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকের ধারণা ছিল মিসেস ল্যাম্বার্ট এই হাট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃত তথ্য ভিন্ন।

কে ছিলেন সেই রহস্যময়ী ‘বিবি’?

তিনি ছিলেন স্যার উইলিয়াম হোপার্টের স্ত্রী, লেডি হোপ। হাট যখন তিনি চালু করেন, তখন তিনি বারাসাতের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি তখন আর হোপার্টের স্ত্রী ছিলেন না, কারণ হোপার্ট পাটনায় নিহত হলে লেডি হোপ পালিয়ে আসেন এবং পরে উইলিয়াম লাম্বার্টকে বিয়ে করেন।

বারাসাতের ‘মধু মুরালী’ পুকুরের পাড়ে সুদৃশ্য ভবনে তিনি বসবাস করতেন। বিলেত (ইংল্যান্ড) চলে যাওয়ার আগে তিনি বর্তমান হাটখোলা অঞ্চলে যে হাটটি স্থাপন করে যান, তখনকার সাধারণ মানুষেরাই এটিকে বলতেন ‘বিবির-হাট’। উল্লেখ্য, নামকরণ কিন্তু সাধারণ মানুষই করেছিলেন, লেডি নিজে নয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বিবির হাট প্রতিষ্ঠার সময়কালটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের সূচনা পর্ব। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার প্রকৃত শাসক হয়ে ওঠে। ১৭৬৪ সালে কোম্পানি ২৪ পরগনার প্রশাসনিক দায়িত্ব পায়। এই সময়েই লেডি হোপ (পরবর্তীতে লেডি লাম্বার্ট) বারাসাতে এই বাজারের পত্তন করেন।

সেসময় বারাসাতে ইংরেজ শাসকদের বসবাস ছিল উল্লেখযোগ্য—ভ্যানসিটার্ট সাহেবের ভিলা, হেস্টিংসের বাড়ি, কর্নেল চ্যাম্পিয়ানের বাসভবন ইত্যাদি এখানে গড়ে উঠেছিল। লেডি হোপের এই উদ্যোগের পেছনে সম্ভবত স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন চাহিদার পাশাপাশি ইংরেজ কর্মচারী ও তাদের পরিবারের প্রয়োজনীয়তা ছিল।

বিংশ শতাব্দীর বিবির হাট

১৯৩০ সালের দিকে বিবিরহাট বাজারটি অত্যন্ত জমজমাট ও সুপরিচিত একটি হাট ছিল। সেসময় এটি স্থানীয় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাবেচার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে বিবির হাট বারাসাত শহরের একটি পরিচিত এলাকা হিসেবে টিকে আছে। হাটখোলা মোড়ের কাছে অবস্থিত এই বাজারটি এখন একটি কাঁচা বাজারের চরিত্র ধারণ করেছে, যেখানে সবজি, মাছ, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি হয়। স্থানীয়রা এখানে প্রতিদিন সকালে বাজার করতে আসেন।

বিবির হাট এলাকার আশেপাশে গড়ে উঠেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বারাসাত জেলা হাসপাতালের পূর্ব নাম ছিল হাটখোলা ডিসপেনসি, যা ১৮৫৪ সালে শুরু হয়। এছাড়া এই এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে।

কীভাবে যাবেন

বারাসাত শহরে পৌঁছানোর পর স্থানীয় যানবাহন বা রিকশা নিয়ে বিবির হাট (হাটখোলা) এলাকায় যাওয়া যায়। বারাসাত শিয়ালদহ, বনগাঁ ও বসিরহাটের সাথে রেলপথে সুসংযুক্ত। এছাড়া এনএইচ ৩৪ ও ৩৫ এবং এসএইচ ২ বারাসাতের মধ্য দিয়ে গেছে। দমদম বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে মাত্র ৩০ মিনিটে বারাসাত পৌঁছানো যায়।

বিবির হাট কেবল একটি বাজারের নাম নয়—এটি বারাসাতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত স্মারক। লেডি হোপের হাত ধরে ১৭৬০-এর দশকে যে বাজারের সূচনা হয়েছিল, তা আজও স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে আছে। ইতিহাসের নানা ওঠানামা, শাসন পরিবর্তন এবং শহরের বিবর্তনের মধ্য দিয়েও বিবির হাট তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

তথ্যসূত্র:

  1. “ইতিহাসের বারাসাত” – পৃষ্ঠা ৬৩
  2. বারাসতের ইতিহাস – visitbarasat.blogspot.com
  3. প্রাচীন নথিপত্র ও মানচিত্র – Gutenberg Central
  4. উইকিসংকলন – বাংলায় ভ্রমণ
  5. স্থানীয় ইতিহাস ও সংবাদ সূত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *