মূল তথ্যসূত্র: দেবাশীষ অধিকারী ও পরিমল দাসের লেখা

বারাসাতের বুকে ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন ইতিহাস, লোককথা ও হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যের স্মৃতি। সেই ইতিহাসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদু অঞ্চলের মাকড়শা পুকুর। প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো এই সুবিশাল পুকুর একসময় এলাকার মানুষের পানীয় জলের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। অথচ কালের বিবর্তনে এবং মানুষের যথেচ্ছ ব্যবহারে সেই ঐতিহ্যবাহী জলাশয় আজ তার পুরোনো সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ হারাতে বসেছে। মাকড়শা পুকুরের ইতিহাস শুধু একটি জলাশয়ের জন্মকথা নয়, বরং বারাসাতের অতীত, জনজীবন, জলসংকট এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তারও এক গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান।

পুকুর খননের নেপথ্যে জলকষ্টের ইতিহাস

লেখক দেবাশীষ অধিকারীর ‘মাকড়শা পুকুর’ বিষয়ক বিবরণ এবং পরিমল দাসের ‘বারাসাতের কথা’ বইয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, কয়েকশো বছর আগে বারাসাত ও তার আশপাশের অঞ্চলে জলকষ্ট দেখা দিয়েছিল। সেই সময় এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুঁতি নদী-সহ অন্যান্য নদীর নাব্যতা ক্রমশ কমে আসছিল। পরিমল দাসের লেখায় নদীটির নাম ‘সুবর্ণবতী বা সুঁতি নদী’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। নদীগুলির নাব্যতা হ্রাসের ফলে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জলের সংকট দেখা দেয়। সেই পরিস্থিতিতে জনসাধারণের জলকষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে একটি বৃহৎ পুকুর খননের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে কথিত আছে।

দেবাশীষ অধিকারীর বিবরণ অনুযায়ী, জোরজার জমিদার বংশের একজন উত্তরাধিকারী এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, পরিমল দাসের ‘বারাসাতের কথা’ বইয়ে জমিদার বংশের নাম ‘জোজোড়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় বিবরণেই পুকুরটি খননের সঙ্গে একটি জমিদার পরিবারের সদাশয় ব্যক্তির নাম জড়িয়ে রয়েছে।

মকর সংক্রান্তি পুকুর থেকে মাকড়শা পুকুর

দেবাশীষ অধিকারীর লেখা অনুসারে, গোলা কাছারি রোডের পূর্ব প্রান্তে বাদু অঞ্চলে প্রায় বাহান্ন বিঘা জমি জুড়ে এই সুবিশাল পুকুরটি খনন করা হয়েছিল। পুকুরটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উৎসর্গ করা হয় মকর সংক্রান্তির পুণ্য তিথিতে। সেই উপলক্ষ থেকেই পুকুরটির নাম হয়েছিল ‘মকর সংক্রান্তি পুকুর’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নামটির পরিবর্তন ঘটে এবং লোকমুখে তা অপভ্রংশ হয়ে ‘মাকড়শা পুকুর’ নামে পরিচিতি লাভ করে বলে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।

পরিমল দাসের ‘বারাসাতের কথা’ বইতেও প্রায় একই কাহিনির উল্লেখ রয়েছে। তাঁর লেখায় বলা হয়েছে, এক মকর সংক্রান্তিতে পুকুরটি জনসাধারণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল এবং কালের বিবর্তনে নাম পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান নামটি প্রচলিত হয়। তবে পুকুরটির নামকরণ নিয়ে আরেকটি জনশ্রুতিও রয়েছে।

মাখন সাহার নামেও রয়েছে আরেক কাহিনি

দেবাশীষ অধিকারীর লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে মাখন সাহা নামে এক ব্যক্তি এই পুকুরটি খনন করিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তির নাম থেকেই পুকুরটির নাম ক্রমশ ‘মাকড়শা পুকুর’ হয়ে ওঠে বলে শোনা যায়। অর্থাৎ, পুকুরটির নামের উৎপত্তি সম্পর্কে অন্তত দুটি পৃথক লোককথা প্রচলিত রয়েছে। প্রথমটি মকর সংক্রান্তির সঙ্গে যুক্ত, আর দ্বিতীয়টি মাখন সাহা নামের এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

তবে এই দুই কাহিনির মধ্যে কোনটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত, তা নিশ্চিত করার মতো স্বতন্ত্র প্রামাণ্য দলিল এখানে উল্লেখিত নেই। তাই এগুলিকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের পরিবর্তে স্থানীয় জনশ্রুতি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

একসময়ের পরিচ্ছন্ন জলাশয় ও জনজীবন

মাকড়শা পুকুর একসময় বাদু ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেবাশীষ অধিকারীর বিবরণ অনুসারে, পুকুরটি থেকে বহু মানুষের পানীয় জলের চাহিদা পূরণ হতো। সেই সময় পুকুরটির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। পুকুরের জল যাতে পানীয় হিসেবে ব্যবহারযোগ্য থাকে, সেই উদ্দেশ্যে এর পাড়ে মলত্যাগ, কাপড় কাচা কিংবা স্নান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল বলে তাঁর লেখায় উল্লেখ রয়েছে।

এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, পুকুরটি শুধু একটি বড় জলাশয় ছিল না; জনসাধারণের জীবনধারণের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক ছিল। পানীয় জলের উৎস হিসেবে এর গুরুত্বই সম্ভবত পুকুরটির পরিচ্ছন্নতা রক্ষার জন্য তৎকালীন বিধিনিষেধের কারণ ছিল।

মাটির পাহাড়, আমগাছ ও হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য

মাকড়শা পুকুরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর চারপাশের উঁচু পাড়। দেবাশীষ অধিকারীর লেখায় বলা হয়েছে, পুকুরটি খননের সময় চারপাশে তোলা মাটি দিয়ে উঁচু পাড় তৈরি করা হয়েছিল। সেই পাড়গুলি একসময় পাহাড়ের মতো উঁচু ছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় গোবিন্দ ভাটার কাজে ব্যবহারের জন্য সেই মাটির সিংহভাগ বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে তাঁর লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে পুকুরের চারপাশের প্রাকৃতিক গঠন ও সৌন্দর্য অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।

পরিমল দাসের ‘বারাসাতের কথা’ বইতেও পুকুরটির চারপাশে আমগাছে ঘেরা মনোরম পরিবেশের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পুকুরের পাড় ভেঙে যাওয়া এবং যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে সেই সৌন্দর্য আজ ক্ষতিগ্রস্ত। একসময় যে পুকুর তার বিশালতা ও সবুজ পরিবেশের জন্য পরিচিত ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চেহারা ক্রমশ ম্লান হয়ে পড়েছে।

পুকুরের রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্তমান সংকট

দেবাশীষ অধিকারীর বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, একসময় শ্রীমতী আসুরা বিবি পুকুরটির দায়িত্বে ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে পুকুরটির রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হয়েছে, তার ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায় না। লেখাটিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পুকুরের মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে—কখনও রাতের অন্ধকারে, কখনও প্রকাশ্য দিবালোকে। এর ফলে পুকুরটির স্বাভাবিক গঠন ও সৌন্দর্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে লেখক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

আজ পুকুরটি আগের মতো পরিচ্ছন্ন নেই বলেও তাঁর বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। যে জলাশয় একসময় মানুষের পানীয় জলের অন্যতম উৎস ছিল, তার বর্তমান অবস্থা তাই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের বিষয়। পুকুরের চারপাশের বড় বড় আমগাছ এবং পাড়ের জমি নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেবাশীষ অধিকারী। তাঁর মতে, এই এলাকার জমি ও গাছপালার প্রতি বিভিন্ন মহলের নজর পড়েছে, যা পুকুরটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

শুটিংয়ের স্মৃতি থেকে বর্তমানের অবক্ষয়

দেবাশীষ অধিকারীর লেখায় আরও একটি আকর্ষণীয় তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, একসময় মাকড়শা পুকুরে কয়েকটি বাংলা সিনেমা, টেলিভিশন সিরিয়াল এবং অ্যালবামের শুটিং হয়েছিল। পুকুরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, চারপাশের আমগাছ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্ভবত শুটিংয়ের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল। ফলে স্থানীয় ইতিহাসের পাশাপাশি বিনোদন জগতের সঙ্গেও একসময় এই জলাশয়ের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু লেখকের অভিযোগ, বর্তমানে পুকুরের পাড়ে অসামাজিক কার্যকলাপ এবং মদ্যপানের মতো ঘটনা ঘটছে। যে জায়গা একসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জনকল্যাণের জন্য পরিচিত ছিল, তার এমন পরিবর্তন স্থানীয় ঐতিহ্যের অবক্ষয়েরই ইঙ্গিত দেয়।

মাকড়শা পুকুরের ভবিষ্যৎ: সংরক্ষণ কি সম্ভব?

প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো বলে পরিচিত মাকড়শা পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাদু ও বারাসাত অঞ্চলের অতীতের নানা স্মৃতি। এর উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি, জমিদার পরিবারের উদ্যোগের কাহিনি, মকর সংক্রান্তির সঙ্গে নামের সম্পর্ক, পানীয় জলের উৎস হিসেবে গুরুত্ব এবং একসময়ের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ—সব মিলিয়ে পুকুরটি স্থানীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললেই এই ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পুকুরটির প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ, জমির সীমানা ও মালিকানা সংক্রান্ত নথি যাচাই, অবৈধভাবে মাটি কাটা হয়ে থাকলে তার তদন্ত, জলাশয়ের দূষণ রোধ এবং চারপাশের পরিবেশ সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ।

একই সঙ্গে পুকুরটির ইতিহাস নিয়ে আরও গবেষণাও জরুরি। পুরোনো জমিদারি নথি, ভূমি রেকর্ড, স্থানীয় দলিল এবং প্রবীণ বাসিন্দাদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা গেলে এর উৎপত্তি ও নামকরণ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে। মাকড়শা পুকুরকে বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু একটি জলাশয়কে রক্ষা করা নয়, বারাসাতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা। আজ প্রশ্ন একটাই—যে পুকুর একসময় মানুষের জলকষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল, সেই পুকুরের অস্তিত্ব রক্ষায় আমরা কি যথেষ্ট উদ্যোগী হতে পারব?

তথ্যসূত্র ও লেখক পরিচিতি

  1. দেবাশীষ অধিকারী — ‘মাকড়শা পুকুর’ বিষয়ক লেখা। এই বিবরণে পুকুরের আনুমানিক বয়স, বাহান্ন বিঘা জমি, মাখন সাহাকে ঘিরে জনশ্রুতি, শ্রীমতী আসুরা বিবির দায়িত্ব, মাটির পাড় বিক্রি, শুটিংয়ের স্মৃতি ও বর্তমান অবক্ষয়ের প্রসঙ্গ রয়েছে।
  2. পরিমল দাস — ‘বারাসাতের কথা’। এই বইয়ে পুকুরের উৎপত্তি, সুঁতি বা সুবর্ণবতী নদীর নাব্যতা হ্রাস, জমিদার পরিবারের উদ্যোগ, মকর সংক্রান্তির সঙ্গে নামের সম্পর্ক এবং পুকুরটির বর্তমান দুরবস্থার উল্লেখ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *