সিকিম মানেই অধিকাংশ পর্যটকের কাছে গ্যাংটক, ছাঙ্গু লেক, নাথুলা পাস কিংবা উত্তর সিকিমের বরফে ঢাকা উপত্যকা। তবে ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে, প্রকৃতির নিস্তব্ধতার মধ্যে কয়েকটা দিন কাটাতে চাইলে পূর্ব সিকিমের ছোট্ট গ্রাম মারতাম (Martam) হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য, ধাপে ধাপে সাজানো সবুজ চাষের জমি, পাহাড়ি ঝরনা, পাখির কিচিরমিচির আর গ্রামীণ জীবনের সরলতা—সব মিলিয়ে মারতাম যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। কোথায় এই মারতাম? মারতাম পূর্ব সিকিমের একটি শান্ত ও মনোরম পাহাড়ি গ্রাম। গ্যাংটক থেকে প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামটি এখনও বাণিজ্যিক পর্যটনের দৌড়ে খুব বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেনি। ফলে এখানে এলে পর্যটকরা প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পান। চারপাশে ঘন বন, পাহাড়ি ঢাল এবং দূরে বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য মারতামকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মারতাম? সাম্প্রতিক সময়ে অফবিট ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে মারতাম দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর প্রধান কারণ হলো এখানকার নির্জনতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। গ্যাংটকের কোলাহল থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে হলেও মারতামে পৌঁছালে মনে হবে যেন অন্য এক জগতে চলে এসেছেন। পাহাড়ের ঢালে বিস্তৃত ধাপচাষ, মেঘের খেলা এবং সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি আভা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। কী কী দেখবেন? মারতামে এসে শুধুমাত্র হোমস্টেতে বসে থাকলেই মন ভরে যাবে। তবে আশপাশেও রয়েছে একাধিক দর্শনীয় স্থান। রুমটেক মনাস্ট্রি সাংগ মনাস্ট্রি নেহরু বোটানিক্যাল গার্ডেন তেমি টি গার্ডেন গ্যাংটকের বিভিন্ন ভিউ পয়েন্ট পাহাড়ি ঝরনা ও ট্রেকিং ট্রেইল বিশেষ করে রুমটেক মনাস্ট্রি মারতাম থেকে খুব কাছেই অবস্থিত এবং এটি সিকিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ ধর্মীয় কেন্দ্র। প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের জন্য স্বর্গ মারতামের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এখানকার জীববৈচিত্র্য। বিভিন্ন প্রজাতির হিমালয়ান পাখি, প্রজাপতি এবং পাহাড়ি ফুল এই অঞ্চলকে রঙিন করে তোলে। যারা বার্ড ওয়াচিং, নেচার ফটোগ্রাফি কিংবা নিরিবিলি প্রকৃতির মাঝে হাঁটতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য মারতাম এক আদর্শ গন্তব্য। কোথায় থাকবেন? মারতামে বেশ কয়েকটি হোমস্টে ও ছোট রিসর্ট রয়েছে। এখানকার আবাসনগুলিতে স্থানীয় আতিথেয়তা, ঘরোয়া খাবার এবং পাহাড়ি পরিবেশের এক অনন্য অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। অধিকাংশ হোমস্টের বারান্দা থেকেই দেখা যায় সবুজ উপত্যকা ও পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। কীভাবে পৌঁছবেন? প্রথমে ট্রেন বা বিমানে নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) বা বাগডোগরা পৌঁছতে হবে। সেখান থেকে গাড়িতে গ্যাংটক অথবা সিংতাম হয়ে সহজেই মারতাম পৌঁছানো যায়। গ্যাংটক থেকে গাড়িতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। রাস্তার অবস্থাও তুলনামূলকভাবে ভালো। ভ্রমণের সেরা সময় মার্চ থেকে জুন এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই সময় মারতাম ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এই সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি রাস্তায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। যারা পাহাড়কে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চান, ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তাদের জন্য মারতাম নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ গন্তব্য। কাঞ্চনজঙ্ঘার পাদদেশে লুকিয়ে থাকা এই ছোট্ট গ্রামটি এখনও পর্যটনের অতিরিক্ত চাপ থেকে মুক্ত। তাই প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে এবার সিকিম সফরের তালিকায় রাখতেই পারেন পূর্ব সিকিমের অফবিট স্বর্গ—মারতাম।