উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত আজ কালীপুজোর জন্য বাংলার অন্যতম পরিচিত শহর। দীপাবলির সময় শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—সর্বত্র আলো, প্রতিমা, সুসজ্জিত মণ্ডপ ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। বারাসাতের কালীপুজো আজ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, শহরের সামাজিক জীবন, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং স্থানীয় ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংবাদমাধ্যমেও বারাসাতের কালীপুজোর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও উৎসবের বিশাল আয়োজনের উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু এই বিপুল আয়োজনের পেছনে রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বারাসাতে কালীপুজোর সূচনা কোথায় হয়েছিল? শহরের প্রথম কালীপুজো কি কোনও বনেদি বাড়ির অন্দরমহলে শুরু হয়েছিল, নাকি কোনও প্রাচীন মন্দিরকে কেন্দ্র করে এই আরাধনার প্রচলন ঘটেছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসে দক্ষিণ পাড়ার রায়েরায়ন রামসুন্দর মিত্রের বাবুবাড়ি, পূর্ব পাড়ার বাবা ঠাকুরতলার কালীপুজো এবং বারাসাতের অতীতকে ঘিরে থাকা নানা জনশ্রুতি।

দক্ষিণ পাড়ার রায়েরায়ন রামসুন্দর মিত্রের বাবুবাড়ি

বারাসাতের প্রাচীন কালীপুজোর ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি উল্লেখযোগ্য কাহিনি দক্ষিণ পাড়ার রায়েরায়ন রামসুন্দর মিত্রের বাবুবাড়িকে ঘিরে। কথিত আছে, এই বিশাল বনেদি বসতবাড়িতেই একসময় শ্যামা মায়ের আরাধনা অনুষ্ঠিত হত। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই পুজোই বারাসাতের প্রাচীনতম কালীপুজো হয়ে থাকতে পারে।

একটি সময়ে বাংলার বহু বিত্তশালী পরিবার ও জমিদারবাড়িতে পারিবারিক পুজো ছিল সামাজিক মর্যাদা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। বিশাল অট্টালিকার ঠাকুরদালান বা অভ্যন্তরীণ উঠোনে পুজোর আয়োজন করা হত। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, পুরোহিত এবং স্থানীয় মানুষও সেই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন।

রামসুন্দর মিত্রের বাবুবাড়ির কালীপুজোর কথিত ইতিহাসও সেই বনেদি পারিবারিক সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, বিশাল অট্টালিকার মাঝখানে শ্যামা মায়ের আরাধনা হত। কিন্তু পরবর্তীকালে কোনও এক সময়ে সেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়। আজ সেই পুজোর বেদির অস্তিত্বও আর নেই বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

এই কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, পুজোটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্মৃতিও ধীরে ধীরে মুছে যেতে বসেছে। তবে বাবুবাড়ির পুজোকে নিশ্চিতভাবে বারাসাতের প্রথম কালীপুজো বলে ঘোষণা করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক ঐতিহাসিক নথি এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই বিষয়টিকে আপাতত স্থানীয় জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবেই দেখা উচিত।

পূর্ব পাড়ার বাবা ঠাকুরতলার কালীপুজো: আড়াইশো বছরের ঐতিহ্য?

দক্ষিণ পাড়ার পাশেই পূর্ব পাড়ায় রয়েছে বাবা ঠাকুরতলার কালীপুজো। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এই পুজো আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো। যদি এই সময়কাল সঠিক হয়, তাহলে পুজোটির সূচনা আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বা তারও আগে।

তবে প্রাচীন পুজোর বয়স নির্ধারণ করতে শুধু লোকমুখে প্রচলিত তথ্য যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠার দলিল, পুরনো পঞ্জিকা, পারিবারিক নথি, মন্দিরের শিলালিপি কিংবা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংরক্ষিত বিবরণ থাকলে সেই ইতিহাস আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

বাবা ঠাকুরতলার পুজো কীভাবে শুরু হয়েছিল, কে প্রথম পুজোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, প্রথমে সেখানে প্রতিমা পূজিত হত নাকি অন্য কোনও রীতিতে দেবীর আরাধনা করা হত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অনুসন্ধানের অপেক্ষায়। এই অজানা অধ্যায়গুলিই স্থানীয় ইতিহাসের গবেষণাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিবরণে এই পুজোর উদ্যোগীদের মধ্যে কালীকৃষ্ণ মিত্রের মামা মহেন্দ্রনাথ দত্তের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর ভূমিকা ও পুজোর সূচনাকাল সম্পর্কে স্বাধীন লিখিত প্রমাণ পাওয়া গেলে এই তথ্য আরও নির্ভরযোগ্য হবে।

বারাসাতের কালীপুজোর বৃহত্তর ইতিহাস

বারাসাতের কালীপুজোর ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের কথা উঠে আসে—আমডাঙার করুণাময়ী কালীমন্দির। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, এই মন্দিরের সঙ্গে ষোড়শ শতকের ইতিহাস এবং মুঘল সেনাপতি মানসিংহকে ঘিরে নানা কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। ১৫৬১ সালে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয় বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে।

তবে এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। আমডাঙার করুণাময়ী কালীমন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস আর বারাসাত শহরের প্রথম কালীপুজোর ইতিহাস এক বিষয় নয়। একটি প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্ব থেকেই শহরের নির্দিষ্ট কোনও পাড়ায় প্রথম কালীপুজো কোথায় শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না।

বারাসাতের কালীপুজোর ঐতিহ্যকে তাই একটিমাত্র স্থান বা একটি পরিবারের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক হবে না। বনেদি বাড়ির পারিবারিক আরাধনা, প্রাচীন মন্দিরের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং পরবর্তীকালে সাধারণ মানুষের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বারোয়ারি পুজো—সব মিলিয়েই এই অঞ্চলের পুজো-সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে।

দেশভাগের পর বারোয়ারি পুজোর প্রসার

দেশভাগের পর বাংলার সামাজিক ও জনবিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। নতুন বসতি, জনসংখ্যার বৃদ্ধি, পাড়াভিত্তিক সংগঠনের প্রসার এবং সম্মিলিত উৎসবের আকাঙ্ক্ষা বিভিন্ন অঞ্চলের পুজো-সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।

বারাসাতেও বিভিন্ন ক্লাব ও স্থানীয় সংগঠনের উদ্যোগে বারোয়ারি কালীপুজোর প্রসার ঘটেছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এই ধরনের পুজোয় কোনও একটি পরিবারের পরিবর্তে পাড়ার বহু মানুষ একত্রিত হয়ে অর্থ সংগ্রহ, প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা ও পুজোর আয়োজন করেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দর্শনার্থীদের সমাগমের মধ্য দিয়ে বারাসাতের কালীপুজো একটি বৃহত্তর সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। শহরের কালীপুজোর বিপুল জনপ্রিয়তার কথা সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে।

হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস সংরক্ষণ করা জরুরি

দক্ষিণ পাড়ার বাবুবাড়ির পুজোর মতো বহু স্থানীয় ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে। পুরনো বাড়ি ভেঙে গেলে, পুজো বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা প্রবীণদের স্মৃতি লিখিত আকারে সংরক্ষিত না থাকলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই কারণে বারাসাতের প্রাচীন কালীপুজোর ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

  • রায়েরায়ন রামসুন্দর মিত্রের বাবুবাড়ির পুরনো দলিল ও পারিবারিক নথি সংগ্রহ।
  • বাবা ঠাকুরতলার পুজো কমিটি এবং স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া।
  • পুরনো ছবি, পুজোর হিসাবের খাতা, আমন্ত্রণপত্র ও পঞ্জিকা খুঁজে দেখা।
  • স্থানীয় গ্রন্থাগার, সংবাদপত্রের আর্কাইভ এবং আঞ্চলিক ইতিহাসের বই পরীক্ষা করা।
  • লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি ও নথিভিত্তিক তথ্যকে পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ করা।

এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু পুজোর বয়স নয়, পুজোর সঙ্গে যুক্ত মানুষ, সামাজিক পরিবর্তন এবং বারাসাতের অতীত জীবনযাত্রার ছবিও পুনর্গঠন করা সম্ভব।

বারাসাতের প্রথম কালীপুজো কোথায় শুরু হয়েছিল—দক্ষিণ পাড়ার রায়েরায়ন রামসুন্দর মিত্রের বাবুবাড়িতে, পূর্ব পাড়ার বাবা ঠাকুরতলায়, নাকি অন্য কোনও প্রাচীন স্থানে—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণের অপেক্ষায়।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: বারাসাতের কালীপুজোর ঐতিহ্য কেবল আজকের জাঁকজমকপূর্ণ মণ্ডপ বা আলোকসজ্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড় খুঁজতে হবে পুরনো বাড়ি, প্রাচীন মন্দির, পারিবারিক স্মৃতি এবং পাড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের মধ্যে।

ইতিহাসের কাজ শুধু অতীতের গল্প বলা নয়, সেই গল্পের সত্যতা অনুসন্ধান করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করাও। বারাসাতের কালীপুজোর প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে পাওয়ার পথ সেখানেই।

তথ্যসূত্র ও যাচাইয়ের নোট

* আনন্দবাজার পত্রিকা — [বারাসাতের কালীপুজোর উৎসব ও জনপ্রিয়তা] https://www.anandabazar.com/west-bengal/24-parganas/kali-puja-in-barasat-1.893709

* আনন্দবাজার পত্রিকা — [আমডাঙার করুণাময়ী কালীমন্দিরের ইতিহাস] https://www.anandabazar.com/west-bengal/24-parganas/history-and-heritage-of-amdanga-kali-temple-dgtld-1.1228272

* ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা — [আমডাঙার প্রাচীন কালীমন্দির] https://bengali.indianexpress.com/lifestyle/ancient-kali-temple-of-amdanga-518589/

সীমাবদ্ধতা: দক্ষিণ পাড়ার বাবুবাড়ির পুজোকে বারাসাতের প্রথম কালীপুজো এবং বাবা ঠাকুরতলার পুজোকে আড়াইশো বছরেরও বেশি প্রাচীন বলে নিশ্চিত করার মতো নির্দিষ্ট প্রাথমিক নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তাই এই দাবিগুলিকে প্রবন্ধে স্থানীয় জনশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *