পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক ও পরিচিত শহর হল বারাসাত। দীর্ঘ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক বৈচিত্র্যের জন্য এই জনপদ বহুদিন ধরেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। বর্তমানে এটি বারাসাত পৌরসভার অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ভৌগোলিকভাবে বারাসাত গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের অংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরের চারপাশে কাজিপাড়া, নবপল্লি, হৃদয়পুর, নোয়াপাড়া ও সুকান্তনগরের মতো অঞ্চল রয়েছে। শিয়ালদহ-বনগাঁ রেলপথের মাধ্যমে শহরটির যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত হয়েছে। শিয়ালদহ স্টেশন এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সান্নিধ্য বারাসাতকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বারাসাত নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত প্রচলিত রয়েছে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, ‘বারো শেঠ’ শব্দ থেকেই ধীরে ধীরে ‘বারাসাত’ নামের উদ্ভব হয়েছে। আবার অন্যদের মতে, ফার্সি ভাষার ‘বার’ এবং ‘সাত’ শব্দের সমন্বয়ে নামটি গঠিত, যার অর্থ সাতটি বসতি বা জনপদের সমাহার। ধারণা করা হয়, শ্রীধরপুর, হৃদয়পুর, বনমালিপুর, প্রসাদপুর, চাঁপাপুর ও নিশ্চিন্দিপুরের মতো প্রাচীন গ্রামগুলিকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের বিকাশ ঘটে। প্রাচীন নথি ও ঐতিহাসিক গ্রন্থে বারাসাতের উল্লেখ পাওয়া যায়। গুপ্তযুগ থেকে শুরু করে মোগল আমল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই জনপদের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। মোগল আমলের প্রশাসনিক দলিল আইন-ই-আকবরী-তেও বারাসাতের নাম পাওয়া যায়। জানা যায়, যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য-র সেনাপতি শঙ্কর চক্রবর্তীর সঙ্গে এই অঞ্চলের গভীর সম্পর্ক ছিল। কথিত আছে, তাঁর উদ্যোগেই বারাসাতে দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল। আজও সেই ঐতিহ্য বহন করে শহরের প্রাচীন পূজাগুলি অনুষ্ঠিত হয়। একসময় বারাসাত সুন্দরবন সংলগ্ন ঘন বনাঞ্চলের অংশ ছিল। তখনকার নদীনির্ভর জীবন, বাঘ-কুমিরের উপস্থিতি এবং অরণ্যঘেরা পরিবেশ নিয়ে নানা লোককথা আজও শোনা যায়। সুবর্ণবতী ও লাবণ্যবতী নামে পরিচিত দুই প্রাচীন নদী বর্তমানে সুঁটি ও নোয়াই নামে পরিচিত হলেও প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এই নদীপথ একসময় বাণিজ্য ও নৌ-যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে বারাসাতের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস-এর বাসভবন এখানে নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। একই সময়ে নীলচাষের প্রসার ঘটে এবং সমগ্র অঞ্চল নীলচাষ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নীলকর সাহেব ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন এবং তিতুমীর-এর সংগ্রাম এই অঞ্চলের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। নারকেলবেড়িয়ার বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা আজও সেই বিদ্রোহের স্মারক হিসেবে স্মরণীয়। বারাসাতের কাজিপাড়া এলাকাও ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে পীর হজরত একদিল শাহ ইসলাম ধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। তাঁর স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাধিস্থল এখনও এলাকার ঐতিহ্যের অংশ। শিক্ষাক্ষেত্রেও বারাসাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। সরকারি ও বেসরকারি বহু বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এখানে অবস্থিত West Bengal State University, যা ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও Adamas University আধুনিক উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গেও বারাসাতের সম্পর্ক গভীর। সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্মসূত্রে কিছু সময় এখানে কাটিয়েছিলেন বলে জানা যায়। একইভাবে বিভিন্ন ব্রিটিশ প্রশাসক ও গবেষকদের লেখাতেও বারাসাতের উল্লেখ রয়েছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব বারাসাতের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানকার প্রাচীন দুর্গাপূজা বিশেষভাবে বিখ্যাত। পাশাপাশি ‘ডাকাতে কালী’ মন্দিরকে ঘিরে নানা কিংবদন্তি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ডাকাত সর্দার রঘু ডাকাত অভিযানে যাওয়ার আগে এখানে পূজা দিতেন। কাজিপাড়ায় একদিল শাহকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত মেলাও বহু মানুষের সমাগম ঘটায়। বারাসাতের খাদ্যসংস্কৃতিও কম আকর্ষণীয় নয়। হৃদয়পুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানগুলিতে কালাকাঁদ, সরপুরিয়া, জলভরা সন্দেশ ও মিষ্টি দই বিশেষ জনপ্রিয়। পর্যটনের দিক থেকেও বারাসাত গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, হেস্টিংস হাউজ এবং নিকটবর্তী চন্দ্রকেতুগড় ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন এবং লোককাহিনিতে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল আজও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত হলেও বারাসাত নিজস্ব ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে ধরে রেখেছে। আধুনিক নগরায়নের প্রভাব ক্রমশ বাড়লেও এই জনপদের ঐতিহাসিক স্থাপনা, লোকসংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য এখনও তার স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে চলেছে। Post navigation বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসে বারাসতে রক্তদান শিবির, ১৫২ জনের স্বেচ্ছায় রক্তদান EX স্টিকার সংস্কৃতি নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ, ‘রাস্তা সবার জন্য সমান