ইতিহাসের আলোকে বারাসাতইতিহাসের আলোকে বারাসাত

বারাসাত আজ একটি জনবহুল শহর, যা আজ উত্তর ২৪ পরগণা জেলার প্রধান শহর রূপে চিহ্নিত। কালের বিবর্তনে যেখানে তৈরি হয়েছে কোর্ট-কাছারি, খেলার স্টেডিয়াম, গড়ে উঠেছে বড়ো বড়ো শপিং মল। আজ বারাসাতে ট্রেন ও বাস মাধ্যমে যাতায়াতের সুলভ ব্যবস্থা আছে। কিন্তু একটা সময় এই বারাসাত ছিল সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্ত গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল। ছিল ঘন বন, বাঘ-সিংহ বিচরণ করত এই বারাসাত অঞ্চলে।

এই বারাসাতে প্রবাহমান “সুবর্ণবতী”, “লাবণ্যবতী”, “দেবগঙ্গা” নামে তিনটি নদী আজ অতীতের গৌরব হারিয়ে ক্রমশ বিলুপ্তির দিকে ধাবমান। “সুবর্ণবতী” বা “সুটী” সুদূর অতীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হত। যাতায়াত করত বড় বড় বাণিজ্যিক তরী। চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যিক যাত্রার পথ হিসাবেও এই নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই নদীর তীরে মাটিয়াঘাটা, জগদিঘাটা প্রভৃতি অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের বিখ্যাত নৌঘাঁটি। “লাবণ্যবতী” নদীটি আজ “নোয়াই” নামে তার করুণ অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। “দেবগঙ্গা” নদীটি “দেগঙ্গা” নামক জনপদে নদী-বন্দরের বিষাদময় স্মৃতি হয়ে বিরাজমান। এর প্রশংসা গৃহীত হয়েছে ভূতত্ত্ববিদ টলেমি ও পিল্লীর কণ্ঠে। টলেমি একে “গঙ্গারিড” বলে সম্মান জানিয়েছেন।

বারাসাতের ইতিহাসের সুবর্ণময় গৌরব রাজা চন্দ্রকেতুর “চন্দ্রকেতুগড়”। খনা-মিহিরের ঢিবি থেকে দু’কিলোমিটার উত্তরে পদ্মা (বাংলাদেশের পদ্মা নয়) তার বুক চওড়া করে আজও বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই প্রাচীন নগরীর প্রাণশক্তি ছিল পদ্মা।

বিভিন্ন সময়ে বারাসাতে আবিষ্কৃত হয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন দ্রব্যাদি। চন্দ্রকেতুগড়, বেড়াচাপা, হাবড়া, মাধবপুর, বারাসাতের দক্ষিণপাড়া প্রভৃতি অঞ্চল বারাসাতের প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। কিছুকাল পূর্বেই বারাসাতের দক্ষিণপাড়া অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে বিষ্ণুমূর্তি ও বৌদ্ধযুগের মৃৎপাত্র এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি। চন্দ্রকেতুগড় বহু আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে। মিলেছে সম্রাট অশোকের মৌর্য যুগ থেকে শুঙ্গ, কুষাণ, গুপ্ত প্রভৃতি যুগের ধারাবাহিক নিদর্শন, যা আজ চূড়ান্ত অবহেলা ও উদাসীনতায় হাজার হাজার বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে ধুঁকছে।

চন্দ্রকেতুগড় থেকে উদ্ধার হওয়া দ্রব্যাদি থেকে জানা গিয়েছে, এখানে মৌর্যযুগ থেকে বিভিন্ন সভ্যতার মানুষ বসবাস করত। আনুমানিক সাতশো বছর আগে এখানে রাজা চন্দ্রকেতুর রাজত্ব ছিল। স্থানীয়দের কথায়, রাজা চন্দ্রকেতু রানীর কথায় জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছিলেন। খনা জিহ্বা কেটে জ্যোতিষচর্চা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এই চন্দ্রকেতুগড় ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম।

চন্দ্রকেতুগড় থেকে বেড়াচাপা মোড় পার হলেই খনা-মিহিরের ঢিবি, যেখানে খনার বাড়ি ছিল। ১৯৫৬-৫৭ সাল নাগাদ খনার বাড়ি খনন করে পাওয়া যায় এক বিশাল মন্দির। এখান থেকে উদ্ধার হয় ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা সিল, জাহাজ চিহ্ন, মুদ্রা সহ বহু মূল্যবান পাথর। স্থানীয়দের মতে, খনা ছিলেন সিংহল রাজকন্যা। জগৎবিখ্যাত জ্যোতিষী বরাহের পুত্র মিহিরের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। খনার বচন আজও লোকমুখে প্রচলিত—

“নিত্যি নিত্যি ফল খাও, বদ্যি বাড়ি না যাও।”
“যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজা পুন্য দেশ।”

ষোড়শ শতাব্দীতে বারাসাতের কাজিপাড়ায় থাকতে শুরু করেন পীর পয়গম্বর মহঃ একদিল শাহ। গৌড়ের হবশী সুলতানদের রাজত্বের শেষ সময়ে অথবা সুলতান হুসেন শাহের রাজত্বের প্রথম দিকে এই দরবেশ ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে আসেন বলে মনে করা হয়। শোনা যায়, তিনি বহু অলৌকিক শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন। এখানে তাঁর স্মরণে একটি মসজিদ আছে এবং সেখানে বাৎসরিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

ষোলো শতকে বারাসাত ছিল বারো ভুঁইঞার অন্যতম প্রতাপাদিত্যের যশোহর রাজ্যের অন্তর্গত। সম্রাটের নৌসেনাপতি ও বিশ্বস্ত সুহৃদ ছিলেন শংকর চক্রবর্তী, যাঁর বাসস্থান আজও বারাসাতের দক্ষিণপাড়া অঞ্চলে বিদ্যমান। শংকর ছিলেন শক্তিধর ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। মানসিংহ মহারাজের বিরুদ্ধে অভিযানের আগে শংকরকে নিজের দলে টানার চেষ্টা হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে দীর্ঘ দেড় মাস যুদ্ধের পর প্রতাপাদিত্য ও শংকর পরাজিত ও বন্দি হন।

আকবর পত্নী যোধাবাইয়ের অনুগ্রহে আগ্রা থেকে মুক্তি পান শংকর। ফিরে এসে ১৬১৩ সালে দুর্গাপূজার সূচনা করেন। এই দুর্গাপূজা ২৪ পরগণা জেলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হিসেবে পরিচিত।

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর-এর রাজত্বকালে বারাসাতবাসী যুবক রামসুন্দর মিত্র বঙ্গদেশের জমি জরিপের কাজে টোডরমলকে সাহায্য করেন। তিনি “রায়-রায়ান” উপাধি লাভ করেন।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-এর সময় নবাব সিরাজউদ্দৌলা সসৈন্যে বারাসাতে এসে হাজির হন। যুদ্ধহাতিদের জল খাওয়ানোর জন্য খোঁড়া হয় “হাতি পুকুর”।

পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফরের কূটনীতিতে ইংরেজরা জয়লাভ করে। রবার্ট ক্লাইভ মীরজাফরের কাছ থেকে বারাসাতসহ ২৪ পরগণার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বারাসাত নামটির পিছনে নানা জনশ্রুতি রয়েছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, জগৎশেঠ পরিবারের বারোজন সদস্য এখানে বাস করতেন। “বারোশেঠ” শব্দটি অপভ্রংশ হয়ে “বারাসাত” নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

১৭৬৯ সালে জন প্রিন্সেপ বারাসাতে প্রথম নীলচাষ শুরু করেন। প্রথম নীল কারখানা বসে নীলগঞ্জে। তখন বাংলার অন্য কোথাও নীলচাষ শুরু হয়নি।

১৮৩১ সালে তেতুলিয়ার নারকেলবেড়ে গ্রামে তিতুমির-এর নেতৃত্বে জ্বলে ওঠে নীলচাষীদের বিদ্রোহের আগুন। তৈরি হয় বিখ্যাত “বাঁশের কেল্লা”। সরকারি নথিতে এই বিদ্রোহ “বারাসাত বিদ্রোহ” নামে পরিচিত। এটিকে ভারতবর্ষের প্রথম কৃষক বিদ্রোহ বলা হয়।

ইংরেজদের কাছে বারাসাত ছিল সপ্তাহশেষের প্রমোদ নগরী। ওয়ারেন হেস্টিংস, ভ্যান্সিটার্ট প্রমুখ সাহেবরা এখানে বিশাল প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করেন। ১৭৭৪ সালে বারাসাতের কাছারি ময়দানে চালু হয় “রেসকোর্স” বা ঘোড়দৌড়, যা পরবর্তীকালে কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়।

ইংরেজ আমলে বারাসাতে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি।

১৮০২ সালে ভ্যান্সিটার্ট ভিলায় লর্ড ওয়েলেসলি ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করেন। সেই সময় বারাসাত “The Sandhurst of Bengal” নামে পরিচিতি লাভ করে।

বারাসাতে শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৮৪৫ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও প্যারীচরণ সরকার বারাসাতে আসেন। ১৮৪৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “বারাসাত জেলা স্কুল”।

১৮৪৭ সালে মহর্ষি কালিকৃষ্ণ মিত্র প্রতিষ্ঠা করেন ভারতের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। এই উদ্যোগে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিদ্যাসাগর, নবীনকৃষ্ণ মিত্র ও প্যারীচরণ সরকার।

বিধবা বিবাহ আন্দোলনেও বারাসাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

১৮৮৩ সালে বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে বারাসাতে রেলপথ স্থাপন করে। ১৯০৬ সালে চালু হয় বারাসাত-বসিরহাট লাইট রেলওয়ে।

বিশিষ্ট বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার স্যার রাজেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি হাওড়া ব্রিজ ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনিও বারাসাতের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন।

১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসু বারাসাতে আসেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় মহাত্মা গান্ধী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বারাসাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে বক্তব্য রাখেন।

১৯৬৭ সালে নকশাল আন্দোলনের সূচনা এবং ১৯৭১-৭২ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বারাসাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বারাসাতের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস আজও পাঠ্যপুস্তকে যথাযথ স্থান পায়নি। তবুও একথা সত্য যে, ভারতের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানের মতো বারাসাতও এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক জনপদ। এই কারণে আমরা বারাসাতবাসী হিসেবে গর্ব অনুভব করি।

সৌরভ বারুই
(লেখক বারাসাত কলেজের সান্মানিক স্নাতক ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। যোগাযোগঃ ৮২৮২৯২৪৪৫৪)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *